
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি এখন ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। খবর শাফাক নিউজের।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকি বলেন, ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা শুরু থেকেই সংকটে পড়ে। তার অভিযোগ, চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করছে।
হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক উত্তেজনার জন্যও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন বাকি। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের কারণেই সমঝোতাটি এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে একতরফা ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ না থাকে।
বাকি বলেন, 'প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রতিশ্রুতি। যতদিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, ততদিন ইরানও নিজের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবে।'তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, স্থাপনা ও লজিস্টিক অবকাঠামো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ইরান অঞ্চলের কোনো দেশের ওপর হামলা চালায়নি এবং ভবিষ্যতেও চালাবে না।
ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত 'অপরাধের' প্রমাণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইনি পথ অনুসরণ করা হবে বলেও জানান বাকি।
এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে না।বাহরাইনে সোমবার বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাসিন্দাদের শান্ত থাকার এবং দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার প্রেক্ষাপটে এই সতর্কতা জারি করা হয়। খবর এএফপির।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয়েছে। সকল নাগরিক ও বাসিন্দাকে শান্ত থাকার এবং দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
এদিকে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় এক ব্যক্তি নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছে।রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক উপ-গভর্নর ভ্যালিওল্লাহ হায়াতির বরাত দিয়ে জানায়, ‘সোমবার সকালে মার্কিন হামলায় এক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রোববার (১২ জুলাই) গভীর রাতে বন্দর আব্বাস, জাস্ক, সিরিক ও কেশম দ্বীপসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণ হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, এতে কোনো বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।
অন্যদিকে আইআরজিসি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত শত্রু ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হয়েছে। তাদের দাবি, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে হামলায় জ্বালানি ডিপো ও গোলাবারুদ সংরক্ষণাগারে আগুন লেগেছে।
আইআরজিসি বলেছে, ইরানের উপকূলীয় সামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, দুটি জাহাজ থামানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করে।এদিকে ইরানের পাল্টা হামলার পর বাহরাইনে আবারও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতেই নতুন অভিযান চালানো হয়েছে। এক্সে দেওয়া পোস্টে সেন্টকম জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশেই এই হামলা শুরু হয়েছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স দাবি করেন, আইআরজিসি আবারও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। তবে মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও একটি আত্মঘাতী ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এর একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অন্তত ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছিল। এর জবাবে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার দাবি করে তেহরান।
এবারের মার্কিন হামলায় ইরানের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। খুজেস্তান, হরমোজগান ও সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের বিভিন্ন শহরে হামলার খবর পাওয়া গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাস্ক, সিরিক, কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাসও হামলার আওতায় আসে। এসব এলাকায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি, রাডার স্টেশন ও সামরিক স্থাপনা রয়েছে।
এ ছাড়া খুজেস্তানের ওমিদিয়ে, মাহশাহর, বেহবাহান, দেজফুল ও আহভাজ এবং সিস্তান-বেলুচিস্তানের চাবাহার বন্দরের আশপাশেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হামলাগুলোর একটি হয়েছে মারকাজি প্রদেশের খোন্দাব এলাকায়, যেখানে ইরানের ভারী পানির স্থাপনা অবস্থিত।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, খুজেস্তানের মাহশাহরে একটি কৃষি সেচ পাম্পিং স্টেশনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে একজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত এবং আরও চারজন আহত হন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, ভোরের দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে।