
ভর্তির মাত্র দুদিনের মাথায় মৃত্যু হলো ৩০ বছর বয়সী ময়না আক্তারের। নগরীর বন্দর এলাকার এই নারী গত ৬ সেপ্টেম্বর জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক)। গত ৮ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম, সেপসিস ও কিডনি বিকল হয়ে সব শেষ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এভাবেই প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসংখ্য মানুষ।
চমেক হাসপতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভয়াবহ বাস্তবতা। সারি সারি বেডে জ্বরে কাতর রোগীরা শুয়ে আছেন অরক্ষিত। মাথার ওপর নেই কোনো মশারি। যে মশার কামড়ে এই রোগের জন্ম, সেই মশাই যেন এখানে রাজত্ব করছে নির্বিঘ্নে। ময়না আক্তারের মৃত্যু তারই এক নির্মম প্রমাণ। আর এই ভয়াবহ চিত্রের পেছনে দায় শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একার নয়; খোদ রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। যে কারণে এখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩৭১, নারী ৭২৫ এবং শিশু ৫২৫ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৯ জন। সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৪৩২ জন। জেলায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন সীতাকুণ্ডে ৩৪৩ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ১৮৬ ও বাঁশখালীতে ৯০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি বছরের আগস্টে ১ হাজার ২০২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ১৪ হাজার ৮৭ জন আক্রান্ত এবং ১০৭ জনের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার দোহাজারী ইউনিয়নের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী মো. রিফাত ছয় দিন অসুস্থ থাকার পর সোমবার চমেকে ভর্তি হয়েছেন। তার মা নূর জাহান বেগম বলেন, পাঁচ-ছয় দিন আগে রিফাত অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসক জানান, তার ডেঙ্গু হয়েছে। পরে সাতকানিয়া থেকে চিকিৎসক চট্টগ্রামে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিলে তারা চমেকে আসেন।
রিফাতের বেডে মশারি থাকা সত্ত্বেও তা না টাঙানোর কারণ জানতে চাইলে নূর জাহান বেগম বলেন, ‘মশারি রাতে টাঙাব। এখন তো ডাক্তাররাও বলছে না কিছু।’
পাশের বেডে চিকিৎসাধীন কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ২৮ বছর বয়সী তারেকও একই দিন ভর্তি হয়েছেন। তার বমি ও তিন-চার দিন ধরে জ্বর ছিল। তার বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এখানে তো কোনো মশারি নাই। মশারি হয় টাকা দিয়ে কিনতে হবে, আর না হয় বাড়ি থেকে আনতে হবে।’
চমেকের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের মেডিকেল অফিসার ডা. জাকিয়া সুলতানা বলেন, এখানে আসা রোগীদের অধিকাংশই জ্বর ও কাশি নিয়ে আসছেন। গুরুতর অবস্থায় থাকা রোগীরাও এখানে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে রোগীর চাপ বেশি।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন এবং গত পরশু একজন রোগী মারা গেছেন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত রয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় পৃথক চিকিৎসক দলও ডেডিকেটেড ও আলাদাভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রোগীদের উপসর্গ সম্পর্কে তিনি বলেন, চমেক টারশিয়ারি হাসপাতাল হওয়ায় বিভিন্ন স্থান থেকে রেফার হয়ে আসা রোগীদের মধ্যে সাধারণত ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম দেখা যাচ্ছে। রক্তচাপের ওঠানামা, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ও রক্তক্ষরণের মতো ওয়ার্নিং সাইন নিয়ে অনেকে আসছেন। আবার অনেকে শুধু জ্বর নিয়েও ভর্তি হচ্ছেন।
মশারি সংকটের বিষয়ে পরিচালক বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডের রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে। গত সপ্তাহে এমএসএফ থেকে প্রায় ৬ হাজার মশারি সরবরাহ করা হয়েছে এবং সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে স্টোরে রয়েছে। তার দাবি, রোগীরা সচেতনতার অভাবে মশারি ব্যবহার করতে চান না। তবে হাসপাতালের পক্ষ থেকে সকালের রাউন্ডে নিয়মিত রোগীদের মশারি ব্যবহারের জন্য বলা হচ্ছে এবং তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তার মতে, সচেতনতা ছাড়া কেবল ওষুধের মজুদ বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রোগীরা মশারি ব্যবহার না করলে হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত মশারি সরবরাহ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
এদিকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সম্পর্কে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। এর আওতায় ফগিং, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ড্রেনে লার্ভিসাইড টেমিফস স্প্রে করা হচ্ছে। হটস্পট এলাকাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ চলছে।