
রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি জ্বালানি ডিপোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। শনিবার ভোরের আগে সৌদি রাজধানীজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। একই সতর্কতা জারি হয় জেদ্দা, তাইফ ও ইয়ানবুসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলেও।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরব কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তা আবারও সামনে এনেছে। হুতিরা বলছে, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাব হিসেবেই তারা সৌদি ভূখণ্ডে এসব হামলা চালাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি তার ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সহায়তা করবেন? ২০১৯ সালে ইরাক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদির তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সময়ও ট্রাম্প তাকে সহায়তা করেননি। এবারও আনসার আল্লাহ বা হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়ে হোয়াইট হাউসে ফোন করেছিলেন যুবরাজ। কিন্তু ট্রাম্প আবারও না বলেছেন।
গত বছর ট্রাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের সামরিক পরাশক্তির কাছ থেকে প্রায় কোনো সুরক্ষাই নিশ্চিত করতে পারেনি সেই বিনিয়োগ।
ট্রাম্প প্রশাসন রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইরান অবরোধে মার্কিন বাহিনী ব্যস্ত থাকায় নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র খুলতে চান না ট্রাম্প।
এর পরিবর্তে হুতিদের সঙ্গে একটি সমঝোতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভয়াবহ আট বছরের যুদ্ধের পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে ইয়েমেনে অচলাবস্থায় ফেলেছিল হুতিরা। সম্প্রতি ওমানে হওয়া সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, হুতি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। এর ফলে সৌদি জাহাজ ছাড়া আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য লোহিত সাগর উন্মুক্ত থাকবে।অর্থাৎ, হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে সরাসরি জড়াবে না। এতে মোহাম্মদ বিন সালমানকে কার্যত বিপদে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
গোপন বৈঠকে আরব দেশ ও ইসরায়েল
এদিকে জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র আরব দেশগুলোর সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এই বৈঠকের আয়োজন করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সাংবাদিক বারাক রাভিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই ব্যক্তিগত বৈঠকের আয়োজন করেন। এতে ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও মিশরের সামরিক বাহিনীর প্রধানেরা অংশ নেন।
আরব দেশগুলো ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করলেও তা গোপন থাকবে; এমন নিশ্চয়তা এখন তাদের থাকা উচিত নয়। কারণ, ইসরায়েল প্রায়ই এসব বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করে থাকে। পশ্চিমাপন্থি আরব দেশগুলো কয়েক দশক ধরেই ইসরায়েলের সঙ্গে গোপনে বিভিন্ন ধরনের সমঝোতা করে আসছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে হুতিরা
চলতি মাসের শুরুতে হুতি যোদ্ধারা দক্ষিণ হোদেইদা ও পশ্চিম তাইজ থেকে দ্রুত অভিযান শুরু করে। রাতারাতি তারা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মোখা দখল করে। এরপর তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী সেখান থেকে সরে যায়।
যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। হুতিবিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের দাবি, তাদের ৫০০-এর বেশি যোদ্ধা নিহত ও ১ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন। মোখা ও অন্যান্য ফ্রন্টে এখনও সংঘর্ষ চলছে।
ইয়েমেনে হুতিদের ওপর সৌদি হামলার জবাবে সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে হুতিরা। লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও হামলার শিকার হয়েছে। তবে রিয়াদের নতুন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মিত্র তুরস্ক ও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সৌদির পাশে সামরিকভাবে এগিয়ে আসেনি। তাহলে ওয়াশিংটন বা এই দুই দেশ কেউ পাশে না দাঁড়ালে সৌদি আরবের পাশে কে থাকবে?
ইসরায়েলের সহায়তা নিয়েও অনাস্থা
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইয়েমেনিদের বিষয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে।
তবে উপসাগরীয় বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, রিয়াদ ইসরায়েলকে নির্ভরযোগ্য সামরিক অংশীদার হিসেবে দেখছে না।
তিনি দ্য নিউ আরবকে বলেন, রিয়াদ ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা থেকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরতায় যেতে চায় না।
ইরানের মিত্র হুতিরা লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ বন্ধ করে দিতে পারে; এমন আশঙ্কা এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ায় তেল ও ডিজেলের দাম আরও বেড়েছে।
ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আল-মনিটরকে বলেন, এই মুহূর্তে হুতিদের ওপর কারও প্রতিরোধক্ষমতা নেই। আমেরিকানদেরও নেই, আমাদেরও নেই, সৌদিদের তো অবশ্যই নেই। তারা এমন এক অপ্রত্যাশিত শক্তি, যাকে কেউ ধারণা করেনি।
সৌদিকে অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও সৌদি আরবকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও এক টন ওজনের বোমা বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইসরায়েল ও সৌদি আরব; উভয় দেশের জন্য বড় পরিমাণে বোমা সরবরাহ অনুমোদন করেছে।
সৌদি আরবের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এতে রয়েছে ১০ হাজার জেডিএএম গাইডেন্স কিট এবং ১০ হাজার বোমা। এসব বোমার অর্ধেক ৫০০ পাউন্ড ওজনের এবং বাকি অর্ধেক ২ হাজার পাউন্ড ওজনের বিএলইউ-১১৭।
ইসরায়েলের জন্য অনুমোদিত ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজে রয়েছে ৪০ হাজার বোমা; অর্ধেক বিএলইউ-১১৭ এবং অর্ধেক এমকে-৮৪। পাশাপাশি শক্ত প্রতিরক্ষা ভেদ করতে সক্ষম ২০ হাজার পেনিট্রেটর ওয়ারহেডও রয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে ইসরায়েলকে এ ধরনের বোমা সরবরাহের এটিই সবচেয়ে বড় একক চালান।
কীভাবে শেষ হতে পারে যুদ্ধ?
সাম্প্রতিক উত্তেজনা কীভাবে থামানো যায়; এমন প্রশ্নের জবাবে হুতিরা বলছে, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের ১২ বছরের অবরোধ তুলে নিলেই যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব।
হুতিদের জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র মোহাম্মদ আল-বুখাইতি স্কাই নিউজকে বলেন, অবরোধ শেষ করা এবং ইয়েমেনিদের ওপর আগ্রাসন বন্ধ করাই আমাদের লক্ষ্য। বল এখন সৌদিদের কোর্টে; যুদ্ধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত তাদের।
তিনি আরও বলেন, আমরা শুধু অবরোধের জবাবে অবরোধের সমীকরণ তৈরি করেছি। তিনি ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের আকাশ, স্থল ও সমুদ্র অবরোধের কথা উল্লেখ করেন, যা দেশটির মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে এবং ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়েছে বলে হুতিরা দাবি করে।
মার্কিন সাংবাদিক রায়ান গ্রিমের মতে, বৃহত্তর সংঘাতের সমাধান ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর হলেও সহজ। তার মতে, যুদ্ধগুলো বন্ধ করে ইয়েমেন ও ইরানকে সমান অধিকারসম্পন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলাও বন্ধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইরান নীতির সমালোচনা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, হত্যাকাণ্ড, নাশকতা ও অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত চালিয়ে আসছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড জ্বালানি মূল্যের চাপ কমানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হুতিদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা সেই লক্ষ্যেই নেওয়া একটি পদক্ষেপ।
ওয়াশিংটন এখনো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর বৈধ স্বার্থকে স্বীকৃতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত নয়। জুনে ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা আশাব্যঞ্জক মনে হলেও ট্রাম্প দ্রুত তা বাতিল করেন।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গেলে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ট্রাম্প বা তার উত্তরসূরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের সঙ্গে শান্তির পথে যেতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে বর্তমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে।