ঢাকা আজকের তারিখঃ | বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আনসার-ভিডিপি ক্রীড়াঙ্গনের নির্ভরযোগ্য শক্তি: কৃতি খেলোয়াড়দের সংবর্ধনায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আকস্মিক স্পারসো পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী হোয়াইটওয়াশের মিশনে দুর্দান্ত ব্যাট করছে টাইগাররা ৫ বছরের মেগা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে কর্পোরেট চুক্তি করল তুর্কি এয়ারলাইন্স চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের 'সঞ্জীবন' প্রকল্প একটি মহল দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে : মির্জা ফখরুল বিদ্যুতের দাম বাড়ালো সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রক্তপাত বন্ধ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য : সিইসি এবার ড. ইউনূসের শাসনামলের সব ঘটনার তদন্ত চেয়ে রিট ভারতগামী ফ্লাইটে একের পর এক বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্প-শি বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে উদ্বেগ পুলিশকে যেন কেউ দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে বিটিডব্লিউএ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫: সেরা ট্রাভেল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে সম্মানিত হলেন সালাহউদ্দিন সুমন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক জলবায়ু ও শান্তির লক্ষ্যে ঢাকায় বৈশ্বিক নেতৃত্বের ঐক্য-রয়্যাল কনক্লেভ ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রোসাটম মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের অঙ্গীকার : প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার বাগবাড়ীতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী

প্রকল্প অনুমোদনে লাভের কারসাজি

  • প্রকাশের সময় : Jul 29, 2026 ইং
প্রকল্প অনুমোদনে লাভের কারসাজি ছবির ক্যাপশন:
1768459961horizontal2.png

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবে নানা ধরনের কারসাজি করা হচ্ছে। বাস্তবসম্মত তথ্যের পরিবর্তে কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অনেক অলাভজনক প্রকল্পকেও লাভজনক হিসেবে দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই হিসাব মেলানোর জন্য কৃত্রিমভাবে তথ্যের পরিবর্তন করা হয়। অর্থাৎ, প্রকল্প বাস্তবে লাভজনক না হলেও কাগজে-কলমে তাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে সরকার ভুল প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং সরকারি সম্পদের অপচয় বাড়ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

অর্থনৈতিক কারসাজির পাশাপাশি সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদন, ভুল এলাকা নির্বাচন, অর্থায়ন নিশ্চিত না হয়ে প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্পের টাকায় রাজস্ব খাতের ব্যয়সহ আইএমইডির প্রতিবেদনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১৮টি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি প্রকল্প শুরু হওয়া থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা, তথ্যের কারসাজি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং সুপারিশ’ শীর্ষক উপস্থাপনায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। সভায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শকিল আখতার, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।আইএমইডির প্রতিবেদনে যে ১৮টি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে, তা মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার দুর্বলতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়ন-পরবর্তী মূল্যায়নের দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেট সামঞ্জস্যের ঘাটতি, প্রকল্প গ্রহণে দ্বৈততা, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, গুচ্ছ প্রকল্পে সমন্বয়ের ঘাটতি, উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ডিপিপি/টিএপিপি প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্প প্রণয়নে ক্রয় কৌশল ও ক্রয় পরিকল্পনার দুর্বলতা, প্রকল্প সংশোধন ও মেয়াদ বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বাস্তবায়ন-উত্তর জনবল ব্যবস্থাপনা।এ ছাড়া প্রকল্প প্রণয়নে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিষয়সমূহের অপর্যাপ্ত অন্তর্ভুক্তি, পরিচালন বাজেটের আওতায় বাস্তবায়নযোগ্য কার্যক্রমকে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনে নীতিমালা অনুসরণের ঘাটতি, প্রকল্প পরিচালনা কমিটির কার্যকারিতায় দুর্বলতা, ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়নে ঘাটতি, প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন প্রণয়ন, মূল্যায়ন ও ফলোআপ কার্যক্রমে দুর্বলতা এবং প্রকল্প অনুমোদনের তারিখ ও বাস্তবায়ন মেয়াদের মধ্যে অসামঞ্জস্য।

ব্যয় ও ঝুঁকি গোপন: আইএমইডির প্রতিবেদনে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্প অনুমোদনের জন্য এনপিভি, আইআরআর এবং বিসিআরের মতো সূচকগুলো ব্যবহার করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য এর অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (আইআরআর) প্রচলিত ১১ শতাংশ ডিসকাউন্ট ফ্যাক্টরের চেয়ে বেশি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এ হিসাব মেলানোর জন্য কৃত্রিমভাবে তথ্যের পরিবর্তন করা হয়। এনপিভি, আইআরআর ও বিসিআর নির্ধারণের সময় প্রায়ই বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য ব্যবহার করা হয় না।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে আসা অর্থের সময়মূল্য, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং কাজ শেষ হওয়ার পর তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে বিশাল খরচ হবে, তা যথাযথভাবে হিসাবে নেওয়া হয় না। ফলে অনুমোদনের সময় প্রকল্পের যে আর্থিক সুফল দেখানো হয়, বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। তথ্যের এই অসংগতির কারণে সরকার অনেক সময় ভুল বা দুর্বল এবং অলাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, যা সরকারি সম্পদের অপচয় ঘটায়।

বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ফলাফলহীন উন্নয়ন অনেক প্রকল্পে লক্ষ্যমাত্রা বা ফলাফল মাপার কোনো সুনির্দিষ্ট সূচক থাকে না। মূল্যায়নের অনুপস্থিতি প্রকল্প অনুমোদনের সময় লাভের যে বড় বড় হিসাব দেখানো হয়, কাজ শেষ হওয়ার পর তার প্রকৃত অবস্থা আর যাচাই করা হয় না। অর্থাৎ, যে উদ্দেশ্য নিয়ে জনগণের টাকা খরচ করা হলো, তা আসলে পূরণ হয়েছে কি না তার কোনো সঠিক মূল্যায়ন নেই। প্রকল্প শেষে বাধ্যতামূলক যে সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) দেওয়ার কথা, তাও অনেকে জমা দেন না। ফলে আগের প্রকল্পের ভুল থেকে পরবর্তী সময়ে শিক্ষা নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এতে সরকারি বিনিয়োগের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদন: আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে তার গুরুত্ব যাচাই করার জন্য পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা জরুরি; কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্প গ্রহণের আগে কোনো পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সমীক্ষা করা হলেও তা কোনো দক্ষ বা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে করানো হয় না। ফলে তথ্যের মান ঠিক থাকে না। কাজ শুরু হওয়ার পর দেখা যায় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পরিকল্পনার কোনো মিল নেই। তখন বারবার নকশা ও ব্যয় পরিবর্তন করতে হয়। এতে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভুল করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় মানুষের অবস্থা বা ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনা না করেই অনেক সময় প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়। ফলে বাস্তবায়নের সময় দেখা যায় জমির সমস্যা বা অন্য কোনো যান্ত্রিক কারণে কাজ আটকে গেছে। তখন মাঝপথে প্রকল্পের নকশা ও কাজের পরিধি বদলাতে হয়, যা প্রকল্পের গুণগত মান কমিয়ে দেয়।

ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতাও প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করা হয়েছে আইএমইডির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে জমি হাতে পাওয়ার আগেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে ভূমি অধিগ্রহণের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ দিতে দেরি হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ভূমি হস্তান্তরে বিলম্ব ঘটে। অনেক সময় জমি হাতে পাওয়ার আগেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে কাজ শুরু করতেই প্রকল্পের মেয়াদের অনেকটা সময় পার হয়ে যায়।

অনেক ক্ষেত্রে জমি হাতে পাওয়ার আগেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা যায় না। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ দিতে দেরি হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ভূমি হস্তান্তরে বিলম্ব ঘটে। এতে নির্মাণকাজ আটকে থাকে, প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং এবং প্রকল্পের ব্যয় অহেতুক বেড়ে যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের তারিখ এবং কাজ শেষের মেয়াদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনুমোদন পেতেই অনেক সময় পার হয়ে যায়। ফলে কাজ শুরু করতে করতেই প্রকল্পের মেয়াদের অনেকটা সময় শেষ হয়ে যায়। এরপর সময়ের চাপে তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে মান খারাপ হয়। বারবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর কারণে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

অর্থায়নে নিশ্চিত না করে প্রকল্প গ্রহণকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে আইএমইডি। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, টাকা কোথা থেকে আসবে তা নিশ্চিত না করেই অনেক সময় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এতে প্রকল্পের মাঝপথে অর্থসংকট তৈরি হয় এবং বাস্তবায়ন দেরি হয়। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর ব্যয়সীমা অনেক সময় বিবেচনা করা হয় না। ডিপিপিতে প্রকল্পের যে খরচের পরিকল্পনা থাকে, এডিপি বরাদ্দের সঙ্গে তার কোনো মিল থাকে না। এর ফলে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ দরকার হয়। আবার একই ধরনের কাজ করার জন্য একাধিক মন্ত্রণালয় আলাদা আলাদা প্রকল্প নেয়। এতে সম্পদের অপচয় ঘটে।

রাজস্ব বাজেটের কাজ উন্নয়ন প্রকল্পে: আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গাড়ি কেনা, অফিস পরিচালনা বা জনবলের বেতনের মতো রাজস্বধর্মী কাজগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী এ খরচগুলো রাজস্ব বাজেট থেকে আসার কথা। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের টাকায় এসব নিয়মিত খরচ মেটানোর ফলে প্রকল্পের মূল কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পের মূল কাজের চেয়ে নিয়মিত খরচ মেটানোর দিকে ঝোঁক বেশি দেখা যাচ্ছে, যা উন্নয়ন বাজেটের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। এসব সমস্যার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এসব কার্যক্রম রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরের কোনো সঠিক পরিকল্পনাও থাকে না। এতে সরকারি সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না।

প্রশাসনিক অদক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব: আইএমইডি বলছে, একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অযোগ্যদের পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়, কাজের ধারাবাহিকতা থাকে না এবং জবাবদিহি কমে যায়।

এ ছাড়া প্রকল্প তদারকি কমিটিগুলোর সভা নিয়মিত হয় না। এমনকি অনেক সময় আইএমইডি বা পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানোর আগে এই কমিটিগুলোতে কোনো আলোচনাও করা হয় না। ক্রয় পরিকল্পনা ও কৌশল যথাযথভাবে না থাকায় এবং বাজার বিশ্লেষণ ছাড়াই প্যাকেজিং করায় ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থের অপচয় ঘটে।

সময়ের অপচয়

প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প অনুমোদন পেতেই অনেক সময় পার হয়ে যায়। ফলে কাজ শুরু করতে করতেই প্রকল্পের মেয়াদের অনেকটা সময় শেষ হয়ে যায়। এরপর সময়ের চাপে তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে মান খারাপ হয়। বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণে সরকারের খরচ বাড়ে এবং সাধারণ মানুষ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

এ ছাড়া, বিদেশি সহায়তা নিশ্চয়তা পাওয়ার পরও প্রকল্প দলিল ডিপিপি তৈরি করতে অনেক সময় নেওয়া হয়। এতে বিদেশি সাহায্যের টাকা সময়মতো কাজে লাগানো যায় না। কেনাকাটার পরিকল্পনা বা প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান প্রকল্প দলিলে ঠিকমতো থাকে না। বাজার বিশ্লেষণ না করেই কেনাকাটার প্যাকেজ তৈরি করা হয়। এতে কেনাকাটার গতি কমে যায় এবং প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকলেও উন্নয়ন প্রকল্পে এর কোনো প্রতিফলন থাকে না। পরিবেশের ওপর প্রকল্পের প্রভাব কেমন হবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা হয় না।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮টি চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে না পারলে সরকারি বিনিয়োগের সঠিক ফল পাওয়া যাবে না। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ কিছু সুপারিশ দিয়ে আইএমইডি বলছে, তথ্যের কারসাজি বন্ধ করে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে বাস্তবসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে শুরুতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং প্রকল্প অনুমোদনের আগেই ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা সম্পন্ন করা, অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট উৎস নিশ্চিত করা এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর ব্যয়সীমা অনুসরণ করা জরুরি। এ ছাড়া প্রকল্প দলিলে বাধ্যতামূলকভাবে সঠিক ক্রয় কৌশল ও পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা এবং জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গতি আনতে একজন কর্মকর্তার বিপরীতে একটি মাত্র প্রকল্প বরাদ্দ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ‘পিডি পুল’ গঠন করার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প সংশোধন সর্বোচ্চ দুবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, নিয়মিত পিআইসি/পিএসসি সভা নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবসম্মত সময় ও জনবল কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত। এ ছাড়া প্রকল্প শেষে নির্ধারিত সময়ে সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা দেওয়া এবং রাজস্ব খাতের নিয়মিত ব্যয় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগের সঠিক সুফল নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশিদ কালবেলাকে বলেন, ‘প্রকল্পের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে লাভের হিসাব মেলানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর তথ্য ব্যবহার করা হয়। প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেই এমনভাবে তথ্য সাজানো হয় যাতে দেখা যায় খরচ অপেক্ষা আয় বেশি হবে। মূলত প্রকল্প যেন দ্রুত অনুমোদিত হয়, সেই কৌশল হিসেবেই বেশি লাভ দেখানো হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা দরকার হলেও মিটিংগুলোতে সাধারণত কেউ তা করে না। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন এবং আইএমইডি দায় এড়াতে পারে না।’

আইএমইডিএর চিহ্নিত চ্যালেঞ্জগুলোকে গতানুগতিক মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প পাসের সময় তাদের এ বিষয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) বা একনেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সভায় এসব বিষয় পয়েন্ট আউট করা হয় না। প্রকল্প পাসের সময় চুপ থেকে শেষে এসে এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই।’

পিসিআর জমা না দেওয়াকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক পরিকল্পনা সচিব বলেন, ‘যেসব সংস্থা আগের প্রকল্পের পিসিআর দেয়নি, তাদের নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।’


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক:

কমেন্ট বক্স